কপালের ঠেলায় পরে, উপরয়ালার ইচ্ছায় ২০০৮ সালে একটা স্কলারশীপ নিয়ে বেলজিয়ামে পড়তে আসলাম। আর মাস তিনেক পরে ফেরত যাবার কথা। অন্নদাতারা বলে দিয়েছে উনারা আর পয়সাপাতি দিতে পারবেনা। যাইহোক আমি গরীব দেশের অপুষ্টিতে ভোগা মানুষ, এই দেশে এসে দুটো ভালো মন্দ খেয়েছি, গালে আলগা চর্বি জমিয়েছি, লিকলিকে দেহের হাড্ডির সাথে কিছু মাংস উকিঝুকি দিচ্ছে। সবই উনাদের দান। আমি বড়ই কৃতজ্ঞ, আহলাদিত এবং পুলকিত।
সাথে উপজাত হিসাবে যোগ হয়েছে লোকজনের বাড়তি খাতির। বিদেশে কেউ থাকলেই লোকজন অকারনেই একটু বাড়তি খাতির করে। আশা করছি ৩ মাস পরে খাতিরের মাত্রা রিখটার স্কেলে দশমিকের ঘরে নেমে আসবে। খাতিরকারীগন নতুন কোন প্রবাসীর সাথে খাতির জমাবে। খাতিরের কোন অভাব আমাদের নেই। দিল ভর্তি খাতির, উপচিয়ে পড়ছে প্রতিদিন। রেগুলার উদারহস্তে বিলিয়েও খাতিরভান্ডার খালি করতে পারছিনা। বড়ই মর্মান্তিক।
খাতিরের মাধ্যমটা হলো আবার ফেসবুক নামক একটা যন্ত্রনা। এই ফেসবুক আর খাতিরের যুগলবন্দিতে আমি ২০০৯ সালের প্রথম বার্ষিক পরীক্ষাতে ৩ টা বিষয়ে ঢেলে দিয়েছিলাম। আবার পরীক্ষাগুলা দিয়ে ২য় বর্ষে পদার্পন করলাম, আর খাতিরের সাথে এখন যোগ হচ্ছে উপদেশ। আমার সার্বিক মংগলার্থে উপদেশ। সেগুলো আবার পয়দা হয় উতকৃস্ট সব মস্তিস্ক থেকে যাদের যোগ্যতা নিয়ে সন্ধেহ প্রকাশ করার দ:সাহস আমি কণকালেই দেখাতে পারিনা। এইসব উপদেশসমুহের [অনেক ক্ষেত্রে আবার একবচন] মধ্যো একটি কথাই সারাংশ। কেনো আসবে দেশে ফিরে? বিদেশে থেকে যাও। বাংলাদেশের কোন ভবিষ্যত নাই, পিএইচডি করার ধান্ধা [লেখাপড়া ইদানিং বড়মাপের ধান্ধা] করো ইত্যাদি এবং ইত্যাদি।
আমি অবাক হইনা, ইশ্বর এই ক্ষমতাটা কেনো আমাকে কম দিলেন তা নিয়ে আমার বিপুল আক্ষেপ। আমি বিব্রত হই, আমি কুন্ঠিত হই, আমি নিজের কাছে করজোড়ে মাফ চাই যেন এইসব কথা আমার স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে গেড়ে না বসে। সবাইকে দিয়ে থুয়ে ছোট্ট একটা ভুখন্ড জগতশেঠরা আমাদের জন্য বরাদ্দ করেছে। সেই দেশ মাত্র ৪০০০ টাকায় আমাকে একটা ডিগ্রি এর ব্যবস্থা করে দিয়েছে। সেই দেশ আর আমার মায়ের মধ্যো কতটুকু পার্থক্য? অহরহ গাইতে শুনি [দেখি] 'দেশ আমার মা', 'জননী জন্মভুমি স্বর্গাদপী গরিয়সী'। সেই গাতকরাই দুই দিন পরে নসিহত দেয় অনাচারে দেশ উচ্ছিন্নে গেছে, বিক্রি হয়ে গেছে, থাকার পরিবেশ নাই। আমি আবার কুন্ঠিত হই। এই দেশই তো আমাকে আমার জীবনের ২৬ বছর খাইয়ে পড়িয়ে রেখেছে, মায়ের মতই দেখা শুনা করেছে প্রতিটি ক্ষনে। আবার যারা বলছে তাদেরও করেছে। তাহলে কি সেই মাকেই তারা বলছে বিক্রি হয়ে গেছে, আসিস না আর ফিরে মায়ের কাছে? আমি নির্বাক থাকি।
হয়তো বাংলাদেশ কে আমি কিছু দিতে পারবোনা। কিন্তু আমি প্রতিক্ষনে শুনি মা আমায় ডাকছে। যা উপেক্ষা করার সাহস আমার নেই। আমি ওই জরাগ্রস্থ মায়ের কাছেই যাবো, আমার মলুহার গ্রামে যাবো যা আমার কাছে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। আর আজীবন করুনা করে যেতে চাই তাদের প্রতি যারা শুধুমাত্র নিজের পকেটেটি ই আগে দেখলো। ব্যাতিক্রম শুধু তারা যারা আরো লেখাপড়া করতে উতসাহ দিয়ে যাচ্ছেন অবিরত। কৃতজ্ঞতা।
Monday, 7 June 2010
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment